শ্রাবণ পিছু হেঁটে ঘুরে পা বাড়ালে কোকিলা কুহু ডাকতে শুরু করল।
‘বিদায়বেলা কু ডাক শোনেছি, এ যাত্রা শুভ হবে না। সরসী! আমি যাচ্ছি।’ শ্রাবণ ডেকে বলল।
‘শ্রাবণ! সুখের দোহাই দিচ্ছি।’ সরসী গলার জোরে বলল।
শ্রাবণ আড়কালার মত হাঁটতে থাকলে, সরসী মনের ঝাল ঝাড়ার জন্য দু হাত মুষ্টবদ্ধ করে কিড়িমিড়ি খেয়ে পা দিয়ে মাটিতে মৃদু আঘাত করে বলল, ‘আঁধলা তুমি আধলাই থাকবে উদলা হয়ে দামালি না দিতে পারবে। লজ্জা লজ্জা কি লজ্জা বলে এখন গলা ফাটিয়ে চেল্লাও রে নেলাভোলা।’
‘জানি আমি হাবাগোবা কিন্তু তুমি তো বুদ্ধিরঢেঁকি ল্যালা।’ বলে শ্রাবণ শরীর কাঁপিয়ে হেসে হাত ওঠিয়ে নাড়ল।
‘শ্রাবণ! আমাকে ফেলে যেয় না, বারবেলায় আমি সময় নির্ধারণ করতে পারব না।’ সরসী ইনিয়ে বিনিয়ে বলল।
‘লালটিক ঠিকঠাক থাকলে দেখা সুখেরবাসরে।’
‘তোমার অপেক্ষায় আমি অপেক্ষমাণ থাকব।’
‘জীবন মানে বেচে থাকা, সংগ্রাম নয় এবং জীবনের শেষ প্রান্তে মৃতু্য অপেক্ষমাণ। আমার কথা মনে রাখলে দিগন্তে পৌঁছে নতুনত্বে বিমোহিত হবে বিমোক্ষণ।’
‘সেচ্চায় ভুলপথে পথিক হলে জীবন অসমাপ্ত থাকবে। প্রিয়জনের অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ হলে অতিষ্টতা মৃতু্য কামনা করায় এ তুমি ভালো জানো। ফিরে আসো সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।’
শ্রাবণ আধকালার মত শোনেও না শোনার ভান করে হাঁটতে শুরু করে নিম্নসুের বলল, ‘আল্লা গো আমার দিকে থোড়া মেহের নজর রেখ। কালবেলায় কালোবিড়ালের ছায়ায় আজ আমি পাড়া মেরেছি।’
এমন সময় বিজলি চমকিয়ে বাজ ফাটল।
শ্রাবণ মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয় বিড়বিড় করে হাঁটতে থাকল।
এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল।
সরসী বিচলিত হয়ে মাথা নেড়ে নিম্নসুরে বলল, ‘এক হায়ন পর এসেছিল। কিন্তু কেন এসেছিল? রিক্ত হাতে চলেই বা গেল কেন? সে চাইলে আজ আমাকে সিক্ত করতে পারত।’
শ্রাবণ বাড়ির বাহিরে এসে পিছন ফিরে না থাকিেয় সদর দরজা বন্ধ করে ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে ডানে হাঁটতে শুরু করল।
সদর দরজার দিকে অপলক দৃষ্টিতে অনেক্ষণ থাকিয়ে সরসী বুক ভরে শ্বাস টেন হাঁফ ছেড়ে চারপাশে তাকিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে বসার ঘরে প্রবেশ করল।
পরিচারিকা কাঁচের কাপে দুধ ছাড়া হাল্ক চা নিয়ে সর্তকতার সাথে প্রবেশ করল।
‘যা বাগান থেকে কাপ খাতা নিয়ে আয়। আর শোন। এই চা ফেলে কড়া আরেক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আয়। মন-মাথা ঝিম ধরেছে। এই চা’য় ঝিমুনি ছাড়বে না।’ বলে সরসী মাথা ঘুরিয়ে সদর দরজার দিকে তাকাল।
পরিচারিকা দ্রুত টেবিলে ট্রে রেখে প্রায় দৌড়ে কাপ এবং খাতা নিয়ে ফিরে সরসীর সামনে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সরসী ওর দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল, ‘শ্রাবণ এসেছিল কেন?’
‘আমি জানি না বিবিজান।’ পরিচারিকা ভয়ে ভয়ে বলে মাথা নাড়ল।
‘আচ্ছা যা চা নিয়ে আয়। খুব কড়া করে বানাবি।’ বলে সরসী রাগকে আয়ত্তে রাখার জন্য ঘনঘন  শ্বাস টেনে হাঁফ ছাড়ল।
সরসীর হাবভাবে পরিচারিকা ভয়ত্রস্ত হয়ে দ্রুত চলে গেল।
সরসী খাতা হাতে নিল। শাড়ীর আঁচল দিয়ে মেঘজল মুছে খাতা খুলে মৃদুম্লান হেসে নিম্নসুরে বলল, ‘তোমার অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ আমি এখন ছন্দের নন্দে নন্দিত হব।’
‘বিবিজান, আর কড়া বানালে বেশী তিতা হয়ে যাবে।’ পরিচারিকা কম্পিতকণ্ঠে বলল।
‘তুই জানলে কেমন করে?’ বলে সরসী মাথা তুলে ওর মুখের দিকে তাকাল।
‘আমি জানি না বিবিজান।’ পরিচারিকা ভয়ে ভয়ে বলল এবং ওর হাত কাঁপতে শুরু করল।
‘আমি তো তোকে মারধর করি না। আমার ভয়ে তুই এত ভয়ত্রস্ত কেন?’
‘আমি জানি না বিবিজান।’ পরিচারিকা অনুচ্চস্বরে বলে মাথা নাড়ল।
‘ফুস-মন্তর দিয়ে আমাকে ফুসলাতে পারবি? আমি আমার জীবন উপভোগ করতে চাই। বনফুলের সুবাসে আমি সুবাসিত হতে চাই। আকাশের নীলে আমি নীলিমা হতে চাই। রংধনুর সাত রঙ্গে আমি রিঙ্গিণী হতে চাই। রঙ্গী সে এখন লীলাখেলায় মত্ত। রঙঢঙ শিখে আমি ও হতে চাই ধিঙ্গি। আয় আমার পাশে বসে আমাকে উপদেশ দে। বার-বিলাসিনী হয়ে আমি অভিলাষী হতে চাই।’
‘ছিঃ বিবিজান। আপনি ফুলের মত পবিত্র। এসব বাজে কথা শোনলে সাহেবের মাথা গরম হয়ে যাবে।’
‘এক হায়ন পর এসেছিল তো।’ সরসী অধীরতায় বিরক্ত হয়ে বলল।
‘আপনি নিজেই তো বলেছিলেন, আপনিই ওনাকে ভোগবাসনাবিমুখ করেছেন।’
‘ত্যাগী পুরুষ হয়নি সে আমাকে ত্যাজ্য করে নিরানন্দ করেছে। নন্দের জন্য আমি এখন নগর বন্দরে ধন্যা দেব।’
‘আপনি অনুমতি দিলে গণিকা কয়েক নিয়ে আসতে পারি। তাদেরকে প্রশ্ন করতে পারবেন। বার নরে না এক বরে সত্য নারী সুখ-শান্তি?’
‘ওরে বাসরে বাস!’ বলে সরসী চোখ কপালে তুলল।
‘কি হয়েছে বিবিজান?’ পরিচারিকা ভয়ে ভয়ে বলল।
‘বার-দরিয়ায় ভেসে বার-দুয়ারির টুকনি না ভরে। বার-নারী দৈহিক সুখ দেয় বার-ফট্টাই নরে। তুই সব জানিস লো!’ বলে সরসী হেসে কুটিপাটি হল।
‘বিবিজান মৃতু্যকে ভয় করুন।’ পরিচারিকা কম্পিত কণ্ঠে বলল।
‘আল্লাহ কে না বলে মৃতু্যকে ভয় করতে বললে কেন?’ সরসী চিন্তিতস্বরে বলে বাহিরে তাকাল।