অপেক্ষমাণ ©

মাঘের মেঘলা দুপুর। শীতের প্রকোপে গাছপালা ঝিম ধরেছে এবং নতুন বউর মত উর্ণা মেঘের আড়ালে সূর্য লুকিয়েছে। পাকাবাড়ির সামনে নয়নাবিরাম বাগান। বাড়ির মালিক নিশ্চয়ই বাগানবিলাসী। থোড়া জমিতে মনোমত সাজানু বাগানে তন্ময় হলে, দেখা যায় দিগন্ত থেকে সবুজ এসে মিশেছে ফোয়ারায়। চিরসবুজ লতা এবং শীতকালিন ফুলগাছের দিকে তাকালে মনে ভ্রমের সৃষ্টি হয়, এমন লাগে যেন ফুলপরীরা ভ্রমরীর সাথে আড়ি দিয়ে মধুচুরের সাথে মিতালিতে মত্ত। অভিনব ফুল এবং ফলে বাগানটা সুজ্জিত।

পলাশতলে চেয়ার টেবিল। বাতাস খাতার পাতা উল্টাচ্ছে। গরম চা থেকে ভাপ ওঠছে। আসে পাশে কেউ নেই।
এক জোড়া কউতর ভাবাবেগে বকবকম করে ভাব জমাতে চাইছে।
ফোয়ারার উত্তর পশ্চিম পাড়ে এক নারী দাঁড়িয়ে এবং সর্তকতার সাথে আলকুশী লতা থেকে ফুল তুলতে চাইছে। কাঁটায় আঘাত পেয়ে চট করে হাত সরিয়ে মুখে বড়ুআঙুল দিয়ে, মাথা তুলে কপাল কুঁচকে ডানে বাঁয়ে তাকালে, এক পরুষ শরীর কাঁপিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
ও ভ্রমরী! তুমি কি আমাকে ভুলে গেলে?
আমি তো তোমাকে ভুলতে চাইনি,
তবুও তুমি চলে গিয়েছিলে,
একটিবারও পিছন ফিরে না তাকালে।
কেন এত নির্দয় হলে,
তোমার মনে তো তামার বিষ ছিল না,
তবে কেন মিছরির ছুরি দিয়ে মনে ঘাঁ দিয়েছিলে?

নারী গম্ভীরকণ্ঠে বলল, ‘সেই তুমি আজ আমাকে ভ্রমরী ডাকলে যে একদিন ভালোবেসে সরসী নাম উপহার দিয়েছিলে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমি বলেছিলাম, সরসে শ্রাবণ ঝরবে বরষায় জলকেলি করব দুজন পঞ্চনদে আসবে জোয়ার আনন্দসলিলে।’
‘জানি সরসী তুমি মরুভূমি হয়ে গিয়েছ এবং আমিও শ্রাবণ হতে পারিনি। ভ্রমরী তুমি ভ্রমরী হয়েছ ইদানিং আমি বাসি পুরষফুল। আমার মাঝে এখন আমার মধু নেই। আমি পানসে হয়ে গিয়েছি।’
সরসী কপাল কুঁচ করে বলল, ‘হ্যাঁ আমি মরুভূমি হয়েছি এবং তোমার হৃদয়হিনতার প্রতিক এই পলাশগাছ।’
শ্রাবণ ঠোঁটবাঁকিয়ে বিদ্রুপ হেেস বলল,
সখি, মনে কত শখ ছিল;
ছিলো চোখে নবরঙ্গের স্বপ্ন,
সুখের দিগন্তে সুখি হব যেয়ে,
পথ চলছিলাম মনানন্দে, তাইরে নাইরে করে;
পবন আমাকে সুখের বর্তা দিচ্ছিল,
কখনো যাচ্ছিল গন্তব্যে,
কখনো ফিরে এসে বলছিল,
তাড়ে চল, সুখ তোর অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ,
আমি উত্তেজিত হয়েছিলাম,
জোর কদমে হাঁটছিলাম,
কিন্তু মাঝ পথে কাল বৈশাখি এসেছিল,
আমাকে থামতে হয়েছিল থোড়াক্ষণ,
এক একটা দণ্ড হায়ন মনে হচ্ছিল যেন।

সরসী বেজার হয়ে শ্রাবণের মুখের দিকে তািকয়ে ধীরকণ্ঠে বলল, ‘আমি বুড়ি হয়ে গিেয়ছি কিন্তু তুমি এখনো সুপুরুষ। প্রতারক হয়ে তুমি আমাকে অভিশপ্ত করলে কেন, আমি তোমার কি ক্ষতি করেছিলাম?’
‘চিন্তার কারণ নেই, বয়সের ভারে সবাইকে বুড়া হতেই হয়। তবে কিছু নর-নারীর মন বুড়া হয় না, আর ওরা হল কবি। তোমার মন না দেহ বুড়া হয়েছে শোনি?’
সরসী আবেগপ্রবণ হয়ে বলল,
বন্ধু তোমার অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ আমি যৌবনকে আঁচলে রেখেছি বেঁধে,
বন্ধু তোমার আশায় মনে পাষাণ বেঁধেছি বুক ভিজিয়েছিলাম বিরহে কেঁদে।
শ্রাবণ বিদ্রুপ হেেস বলল, ‘কেঁদ না পাষাণী তুমি কেঁদ না। তুমি কাঁদলে পলাশগাছটা মরে যাবে। পলাশ নুন পছন্দ করে না গো।’
‘হে প্রিয় পথিক! তুমি কেন পথ হারিয়েছিলে, তোমার অপেক্ষায় প্রহর গোনে আমি অপেক্ষমাণ। পলাশতলে বসে থাকি বিধায় পলাশ আমার সাথে ঠাট্টা করে। তুমি কেন অচেনা পথে হাঁটতে শুরু করেছিলে?’
এমন সময় একটা কোকিল বাগানের আশে পাশে উড়াউড়ি করছিল। টোনাটুনি লেম্বু গাছে বাসা বানিয়েছে। পাপিয়া মহুয়ার ডালে বাসা বানাচ্ছিল। তা দেখে শ্রাবণ দুডালিতে ঢিল ভরে কোকিলাকে নিশানায় আনলে সরসী মাথা নেড়ে কপালে আঘাত করে বলল, ‘তুমি এত হৃদয়হীন কেন?’
শ্রাবণ দুডালি নািময়ে সরসীর দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ হেসে বলল, ‘কোকিলাকে আমি ভালা পাই না। ওরা খুনি। কোকিলার কুহু শোনলে দপ করে আমার গোসার ঘরে আগুন জ্বলে। আমি কোকিল হতে চাইনি চেয়েছিলাম থোড়াই ভালোবাসা। তুমিই আমাকে নৈরাশ করেছিল। তোমার বান্ধবীরা তোমাকে উস্কানি দিয়েছিল। আজ আমি দেখতে এসেছি তুমি কত সুখে আছো?’
পলকে সরসীর মুখের ভাব বদলে গেল এবং রোষ্টসুরে বলল, ‘মন নেই তোমার বুকে একটা পাত্থর। তোমাকে পাথরমানব নামে আজ থেকে ডাকব। তোমার মাঝে দয়া মায়া এক রত্তি মমতা নেই।’
শ্রাবণ অট্টহাসি হেেস বলল, ‘অবলার আঁচল-বাতাসে বৈশাখ মাসের গরম কমে না লো ভ্রমরী।’
সরসী কপাল কুঁচকে তাকালে শ্রাবণ বিদ্রুপহেসে বলল, ‘কপাল কুঁচ করলে মাথায় ব্যথা হয়। বেশি চিন্তা কর না, দুশ্চিন্তায় ভোগবে। আমি শুধু দেখার জন্য এসেছিলাম। সুন্দর বাগান বানিয়েছো। মনের বাগানে কি আশাকলি ফুটেছে?’
সরসী রেগেমেগে বলল, ‘তোমার এমন আখিভঙ্গি আমি পছন্দ করি না। তুমি কয়রাকানা, রূপের আগুনে পুড়ে বল আমিতো রূপ দেখতে পাই না। অপরূপার রূপের জেল্লায় আমি কানা হয়ে গিয়েছি। ঢং কোথাকার! জানো! তুমি ধীরে ধীরে দানব হয়ে যাচ্ছে।’
‘তুমি আমাকে দাবন ডাকলে কেন?’
‘তুমি দানব নয়তো কি?’
‘আমি দানব হলে তুমি যে দানবী হবে তা কি তুমি জানো? কারণ, কোনো একদিন তুমি আমাকে ভালো বাসতে, আজ হয়তো রাগের মাথায় আমাকে ঘৃণা করার বৃথা চেষ্টা করছো।’
‘পাষাণ তুমি বড় কঠিন তোমার হৃদয়। কাটার আঘাতেও উঁফ বল না।’
‘আমার স্পর্শকাতর মনে তুমি এত ব্যথার পাথর ছোঁড়েছ যে আমি পাথর হয়ে গিয়েছি।’
‘লজ্জা হচ্ছে আজ খুব লজ্জা হচ্ছে। নিজেকে কি নামে ডাকা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করছি।’
‘ভ্রমরী তুমি ভ্রমরী! জান তো নির্লজ্জের লজ্জা নেই।’
‘লজ্জিকাও হতে পারব না। আমাকে মুক্তি দাও দোহাই!’
‘নিষিদ্ধপল্লীতে যাই না আমি লজ্জায় লাল হয়ে চৌপথের মোড়ে পথ হারাই।’
শ্রাবণের কথা শোনে সরসী আবেগপ্রবণ হয়ে বলল,
তোমাকে ভুলতে চেয়ে আমি আজো ভুলতে পারিনি,
তোমাকে আমি আজো ভুলতে পারিনি,
ভুলতে পারিনি।
তুমি সদা আছো অন্তরে, গানে আমার মনে,
আমার কবিতায় আমার ছন্দে,
তুমি আছ সঙ্গী হয়ে,
তুমি আছ আমার ধ্যানে
তোমাকে আজো আমি ভুলতে পারিনি,
ভুলতে পারিনি তোমাকে আজো আমি ভুলতে পারিনি।

শ্রাবণ বিদ্রুপ হেসে বলল, ‘আগে তো তাইরে নাইরে করে নেচে মন দিয়েছিলে, এখন হায়রে কইরে করে কেঁদে কি লাভ হবে?’
সরসী বিচলিত হয়ে মাথা নেড়ে বলল,
আগুনে গলে মোম উজ্জল হয়ে অন্ধকারকে করে সমুজ্জল,
চর্বী থেকে মোমে উৎপত্তি এবং চার্বীরা জেল্লাময়ী হয় লাগালে কজ্জল,
আমি আজো অনুজ্জল।
শ্রাবণ ঠোঁট টিপে হেেস বলল, ‘জানো সরসী, লেম্পের আলোতে তিমির মোহতিমির হয়।’
সরসী ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, ‘আজ আমি জ্বলে পুড়ে ছারখার হতে চাই। কামানলে আমাকে অলাত বানাও।’
শ্রাবণ অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, ‘বাতাসের শনশনে আমি মনের কথা শুনি, উত্তুরিতে প্রতিধ্বনিত হয় বিপদের ধ্বনি।’
‘তুমি চলে যাবে?’
‘চলে যাচ্ছে দিন থেমে থাকে না। ফাগুন এসে যায়, মনের আগুন নিভে না, মাঘের শীত সাত হায়নেও ফুরায় না।’
তোমার জন্য দোয়া করি।
‘কি দোয়া করবে?’
সরসী দীর্ঘশ্বাস ছেেড় বলল,
তব স্বপনে যেন স্বপ্নাচারিণী আসে,
কবিতা লিখার মন্ত্র যেন বলে যায় পাশে বসে,
ভোরে কবিতা পড়ার জন্য মম দণ্ড গুনবো আশে,
আজ যেন স্বপ্নচারিণী তব স্বপনে আসে।

‘ঠিকাছে।’ বলে শ্রাবণ পিছন হেঁটে ঘুরে পা বাড়াল।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s